দরিদ্র শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার   নিশ্চিত করুন।

শ্রম ও পুজির দ্বন্দ্ব চলে ।   শ্রমজীবীরা বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং উন্নয়নের চালিকা শক্তি। অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি দুর্দশাগ্রস্ত ও বঞ্চিত। এই স্বল্প আয়ের মানুষদের মজুরি নিয়ে শ্রমিক-মালিক-সরকারের ত্রিমুখী লড়াই চললেও একপর্যায়ে পিছিয়ে যায় শ্রমজীবীরা। তবে হার মাননেনা তাঁরা । সেজন্য প্রয়োজন যুক্তিসঙ্গত আলোচনা, লড়াই ও সংগ্রামের।

চা শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নে দৈনিক নগদ মজুরি ন্যূনতম ৬৭০ টাকা নির্ধারণসহ ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্ত্বা নিশ্চিত করার দাবিতে রোববার (  ১৬ ফেব্রুয়ারী,- ২০২০ )  সকালে গোল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। সিলেটের একটি চা বাগানে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট ফেডারেশন – বি এ এস এফ ।  শ্রী সুভাস নায়েকের সভাপতিত্বে অনুস্টিত সভায় বক্তব্য রাখেন  রতন দাস, রঞ্জন দাস, শান্তি নায়েক সহ বিভিন্ন চা বাগানের শ্রমিক প্রতিনিধিএবং সাধারণ শ্রমিকবৃন্দ।



বক্তারা আরও বলেন, ১৭০ বছর আগে প্রতারণা ও মিথ্যা আশ্বাস দেখিয়ে ভারতবর্ষের উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উরিষ্যা, মাদ্রাজসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে নিয়ে আসা হয় বাংলাদেশের চা বাগানে। সূচনা লগ্ন থেকেই বৃটিশরা শ্রম আদায় করে নিলেও আজ পর্যন্ত   ভাগ্যের তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি শ্রমিকদের।

বৈঠকে শ্রমিকদের ব্যাপক দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরে দ্রব্যমূল্য, পে স্কেল, জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন বিবেচনা করে চা শ্রমিকদের দৈনিক নগদ মজুরি ৬৭০ টাকা দেওয়া, রেশন হিসেবে প্রত্যেক শ্রমিককে সপ্তাহে ৫ কেজি করে এবং নির্ভরশীলদের জনপ্রতি সপ্তাহে ৩ কেজি করে চাল এবং প্রতি শ্রমিককে মাসে ২ কেজি চা পাতা, মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দৈনিক কাজের নিরিখ বৃদ্ধি না করা, নিরিখের অতিরিক্ত প্রতি কেজি কাঁচা পাতা উৎপাদনের জন্য এবং ছুটির দিনে কাজের জন্য দ্বিগুণ হারে মজুরি দেওয়া, চাষাবাদের জন্য প্রদত্ত জমির জন্য সরকার নির্ধারিত ভূমি করের অতিরিক্ত মূল্যের রেশন না কাটাসহ ১১ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়।

দাবিগুলো হচ্ছে; চা শ্রমিকদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকা ও উৎপাদনে সক্রিয় থাকার প্রয়োজনে বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতিপূর্ণভাবে চা শ্রমিকের দৈনিক (সকালের নাস্তা ২০ টাকা + দুপুরের খাবার ৪০ টাকা + রাতের খাবার ৪০ টাকা) ১০০ টাকা হিসেবে ৬ সদস্যের পরিবারের জন্য শুধু খাবার খরচ ৬০০ টাকা প্রয়োজন। এর সাথে আনুষঙ্গিক খরচযুক্ত করে এ পর্যায়ে ন্যূনতম মজুরি দৈনিক ৬৭০ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। চা-শিল্পের মজুরি নির্ধারণে দ্বি-পাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে চলমান নামকাওয়াস্তে মজুরি বৃদ্ধির ধারা বাতিল করে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে নিয়মিত মজুরি নির্ধারণ করা। দ্রব্য মূল্যের উর্দ্ধগতি, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা বিবেচনা করে বার্ষিক ১০% হারে ইনক্রিমেন্ট প্রদান। সাপ্তাহিক ছুটির দিনের মজুরি প্রদানে বেআইনী শর্ত বাতিল করে বাংলাদেশ শ্রমআইন-২০০৬ (অদ্যাবধি সংশোধিত) এর ১০৩(গ) ধারা অনুযায়ী বিনাশর্তে মজুরি প্রদান। কর্মে উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে উৎসব বোনাসের নামে উৎসাহ বোনাস দিয়ে শ্রমিক ঠকানোর অপকৌশল বন্ধ করে সকল শ্রমিককে এক মাসের মজুরির সমপরিমাণ বছরে দুইটি উৎসব বোনাস ও একটি উৎসাহ বোনাস প্রদান। চা শিল্পে শ্রম আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ শ্রমআইন-২০০৬ এর ২৩৪ ধারা মোতাবেক কম্পানির লভ্যাংশের ৫% শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিল ও অংশগ্রহণ তহবিলে প্রদান এবং অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ সংগঠন করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। চা-শিল্পে নৈমিত্তিক ছুটি (বছরে ১০ দিন) কার্যকর ও অর্জিত ছুটি (প্রতি ২২ দিনে ১ দিন) প্রদানে বৈষম্যসহ শ্রম আইনের বৈষম্য নিরসন।

২০০৯ সালে নিম্নতম মজুরি বোর্ড কর্তৃক খসড়া সুপারিশ অনুযায়ী প্রাথমিক চিকিৎসা কর্মী ও যোগালী সর্দারকে মাসিক বেতনধারী, ১ বিঘা জমি পর্যন্ত ক্ষেতে জমির জন্য রেশন কর্তন বন্ধ, প্রতি ২০ পরিবারে জন্য একটি টিউবওয়েল, কম্পানির লভ্যাংশ ৫% প্রদান, মাসিক মজুরির সমান উৎসব দুটি উৎসব বোনাস (কর্মে উপস্থিতির উপর নির্ভর করে উৎসাহ বোনাস নয়), গ্রাচুয়েটি, শ্রমআইনের ৫৯ ধারা অনুযায়ী পায়খানা নির্মাণ ইত্যাদি সুবিধা বাস্তবায়ন এবং ক্ষেতের জমির জন্য রেশন কর্তন সম্পূর্ণ বন্ধ করা। চা ও রাবার শ্রমিকদের পূর্ণাঙ্গ রেশন হিসেবে একটি পরিবারের সাপ্তাহিক প্রয়োজনের অনুপাতে চাল, আটা, ডাল, তেল, চিনি/গুড, সাবান, চা-পাতা, কেরোসিন প্রদান।

চা-বাগানে বসবাসকারী শ্রমিকদের ভোগদখলকৃত ভূমির উপর স্বত্ব অধিকার। সরকারি আইন মোতাবেক মাতৃত্বকালীন ভাতা ৬ মাস এবং প্রত্যেক চা বাগানে অ্যাম্বুলেন্স প্রদানসহ একজন এমবিবিএস ও একজন এমবিবিএস (প্রসুতি বিশেষঞ্জ) ডাক্তার, প্রশিক্ষিত নার্স নিয়োগ করে চা শ্রমিকদের সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ জীবনের জন্য সুচিকিৎসার ব্যবস্থাসহ চা-শ্রমিক সন্তানদের সুশিক্ষার জন্য সকল বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং প্রতি ভ্যালীতে সরকারি কলেজিয়েট স্কুল স্থাপন করতে হবে।