ভিন্নমত, বিজ্ঞান এবং একটি সুন্দর পৃথিবী

ভিন্নমত, বিজ্ঞান এবং একটি সুন্দর পৃথিবীঃ ‘মাওসেতুং এর প্রকৃতির বিরুদ্বে যুদ্ব’ (২০০১) প্রথম পর্ব – জুদিত স্পেরোর মন্তব্য:

প্রকৃতির বিরুদ্বে মাওয়ের যুদ্ব (কেম্ব্রিজ বিশ্ব বিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত, ২০১০) জুদিত স্পেরুর এই বইটি প্রায় এক দশক আগে প্রকাশিত হয়েছে। বইটি নিয়ে নানা রকমের প্রশ্ন থাকলেও এতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ন বিষয় উঠে এসেছে। এটার প্রকাশ কালের সময় থেকেই বিশ্ব পুঁজিবাদের অধিক মুনাফার অর্জনের প্রবনাতা থেকে নানা প্রাকৃতিক সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। যা সত্যিই বিপর্য্যকর। আমাদের চার পার্শ্বে নানা সম্পদের উৎস বিদ্যমান আছে। কিন্তু প্রথম বিশ্বের পুঁজিবাদী চক্র এমন এক ব্যবস্থার আশ্রয় নিয়েছে যার কারনে প্রথম বিশ্বের মানুষের ভোগ বিলাশের জন্য তৃতীয় বিশ্বের মানুষকে খেশারত দিতে হচ্ছে। শুধু তাই নয় তাদের লালসার কারনে আমাদের পৃথিবী ও ধংসের মুখোমুখি হয়েছে। পুঁজিবাদের সৃষ্ট ব্যবস্থা তৃতীয় বিশ্বের বেশীর ভাগ মানুষকে মারাত্মক দারিদ্রতা ও নিপিড়নের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইহা প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতার ও জন্ম দিয়েছেলে। আমি বেশ কয়েক বছর আগে একবার, এলিন ব্রাউনের সাথে একটি প্রচারনা মূলক র‍্যালিতে অংশ গ্রহন করেছিলাম। তিনি সেই দিন আমাদের উদ্দেশ্য বলেছিলেন, এখন আমরা এমন একটি ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি যা বিশ্বের ধনী দরিদ্র সকল দেশের লোকেরাই বিপদে পড়বেন এমন কি ধনিক শ্রেনীর মানুষেরা ও তা থেকে রেহাই পাবেন না । তিনি সম্ভাব্য বিপদের হাত থেকে বিশ্বকে বাঁচানোর জন্য কিছু প্রস্তাব পেশ করেন এবং প্রভাব শালী নীতি নির্ধারকদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর পরিকল্পনা পেশ করেন। প্রচলিত সুপার-মল অর্থনীতিকে কিভাবে অধিকতর কার্যকরী করা যায়? কারা এই সুপার – মলের পন্য উৎপাদন করবে ? কারা সেই মলে পন্য বিক্রির কাজ করবেন ? কিন্তু কর্ম বিমূখ, আলস, সম্পদশালী, সুবিধা প্রাপ্ত ও বিলাশী লোকেরা কেমন করে বুঝবে যে প্রচলিত ব্যবস্থাটি একটি ঝুকি পূর্ন ব্যবস্থা। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। আমাদের সমগ্র সভ্যতাই এখন এক মহা বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পুঁজিবাদী প্রথম বিশ্ব কেবল তৃতীয় বিশ্বের মানুষের জীবন জিবিকাই কেড়ে নেয় নাই এরা তাদের মান সম্মান সকল কিছুই চুরি করে নিচ্ছে। সাথে সাথে আমাদের প্রিয় পৃথিবীকে ও বিপদাপন্ন করে দিচ্ছে। দুনিয়া কাঁদছে, জনগণ বিকল্প ব্যবস্থা চাইছে। বিশ্ব ব্যবস্থার সামগ্রীক পরিবর্তন করা দরকার, সমাজতন্ত্র কায়েম হওয়া প্রয়োজন, আলোকিত সাম্যবাদ কায়েম করা দরকার। আলোকিত সাম্যবাদের জন্য বিজ্ঞান সম্মত নেতৃত্ব দরকার। স্পেরোর বইতে প্রচলিত ব্যবস্থার বিকল্প হিসাবে সাম্যবাদকে প্রস্তাব আকারে দেখানোর প্রয়াস লক্ষ্যনীয়। তাঁর কথায় চীন সঠিক ভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে। স্পেরো দেখাচ্ছেন, মাওয়ের বিপ্লবের পর ভূল ত্রুটি গুলো সংশোধন করে পরিচ্ছন্ন বুদ্বিবৃত্তিক পন্থা, সবুজ বিজ্ঞান এবং প্রাকৃতিক বিশ্ব গড়ার দিকে চীন এগিয়ে যাচ্ছে। তাঁর মতে, কতিপয় ভূয়া বিজ্ঞানী অনুতাপ প্রকাশ করে বলতে চান যে, মাওয়ের আদর্শ খুবই নিয়ন্ত্রিত, প্রভাবক, ক্ষুদ্র ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি যা সবই নাকি প্রকৃতি ও মানবতা বিরোধী এবং বিপর্যয়কর। বিপ্লব, সম্পর্কে স্পেরো বলেছেন, অনেকেই মাওবাদকে একটি মতান্দ্বতায় আচ্ছন্ন করে দেখেছেন যা একেবারেই সঠিক নয়ঃ

“ আমাদের কাহিনী কোন বস্তুগত জগত থেকে শুরু হয়নি বরং তাঁর উৎপত্তি হয়েছে রাজনীতি থেকে- মানুষের মাঝ থেকে সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। ১৯৫৭ সালের গ্রীস্মকালে যাত্রা করে মাত্র কয়েক বছর পর ১৯৪৯ সালে সাম্যবাদিরা বিজয় অর্জন করে। সেই সময় শত শত ও হাজার হাজার চিনা নাগরিককে এবং প্রখ্যাত বুদ্বিজীবি ও বিজ্ঞানীকে নিন্দা করা হয়েছে, নির্দয় ভাবে শাস্তি দেয়া হয়েছে, অপবাদ দেয়া হয়েছে এমনকি ‘ ডান-পন্থার বিরুদ্বে আন্দোলনের’ ক্ষেত্রে ও অনেকেই নিরব ভূমিকা নিয়েছেন। তারা আমাদেরকে বিনাশ করে দিয়ে প্রচলিত সরকারকে গতানুগতিক ভাবে পরামর্শ দিয়ে আরো ভালো ভাবে দেশ চালাতে চেয়েছেন। চীন নিজের ক্ষমতা ও শক্তি হাড়িয়ে প্রতারিত হয়েছে আর বোকার মত নিজেদের পরিবেশকে ধ্বংস করেছে। সমাজের নানা স্তরের মানুষের ভূমিকায় আসছে পাতা গুলোতে বিস্তারিত বর্ননা দিব। তবে আমরা এটা ও দেখব যে মাও কেমন করে ডান পন্থার বিরুদ্বে লড়াই সংগ্রাম করেছেন। কিভাবে কঠিন কঠিন সিদ্বান্ত নিয়ে চীনের পরিবেশকে বিপর্যয় থেকে সুরক্ষা দিয়েছিলেন”। (স্পেরো-২১)

স্পেরো তাঁর নিজের দৃস্টিভংগীতে মাওবাদী শাসন ব্যবস্থার মন্দ দিক গুলো ধরতে কার্পণ্য করেন নাই। তিনি বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সেই শাসন ব্যবস্থা ও অন্যান্য ব্যবস্থার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য পার্থক্য গুলো তুলে ধরতে ব্যার্থ হয়েছেন। তিনি তা ও প্রকাশ করেছেন যে তিনি মাওবাদী শাসন ব্যবস্থার বা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ভক্ত বা অনুসারী হিসাবে চীন ভ্রমণ করে নাই। স্পেরো যদি কোন পক্ষ নিয়ে ও থাকেন তবে তা হলো মাওয়ের জীবদ্বশায় কমিউনিস্ট পার্টির সেই ধারা যারা ছিলো সংশোধনবাদি এবং পুঁজিবাদী, এমন কি তা পশ্চিমা ধাচের উদারতাবাদী নীতির ধারা। আবার এমন ও হতে পারে যে বিপ্লবী ধারায় আমরা যে সকল সমালোচনা করেছি তিনি ও সেই বিষয় গুলোই তুলে ধরেছেন। মাওবাদের ইতিহাস এটা তো আমাদের সম্পদ। এর বিজয় যেমন আমাদের, আবার এর পরাজয় ও তো আমাদেরই। চীনের সমাজতন্ত্র কেন পরাজিত হলো তাঁর জন্য কিকি বিষয় দায়ি জনতার এই প্রশ্নের জবাব দেবার জন্য আমরাই হলাম দায়িত্বশীল ব্যাক্তি। এখানে অন্যদের নাক গলানো অপ্রাসঙ্গিক। ক্ষুদ্র ব্যবস্থাপনার ভূল ত্রুটি, পরিবেশবান্দ্বব বিশ্ব গঠন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের বিপ্লব ধংসের জন্য প্রতিবিপ্লবের ইন্দন দান ইত্যাদী বিষয় নিয়ে তো আমাদেরকেই কাজ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে বরং তিনি যে সকল সমস্যার কথা বলেছেন তা আমরা প্রত্যাখ্যান করে সেই সকল বিষয় আমরা আমাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারি। আমরা অবশ্যই আগের সামাজিক বিপ্লবের উদ্যোগ গুলোকে বিশ্লেষণ করে তা থেকে আগামী দিনের জন্য শিক্ষা গ্রহন করতে পারি। আমরা তাদের বিরূপ সমালোচনাকে ও গ্রহন করতে রাজি আছি। বিজ্ঞান আমাদেরকে যেখানে নিয়ে যায় সেখানে যেতে আমাদের ভয় পাওয়া উচিৎ নয় । যদি আমরা আবার বিপ্লবের নতুন ঢেউ তুলতে চাই তবে আমাদেরকে অবশ্যই তা অনুসরন করতে হবে। মানব জাতি সামগ্রীক স্বাধীনতা অর্জন, নিপিড়নের উচ্ছেদ চাই তবে আলোকিত সাম্যবাদের কোন বিকল্প নাই। নিরাপদ দুনিয়ার জন্য সাম্যবাদ একান্ত কাম্য।

দুই বুদ্বিজিবীর কাহিনী

স্পেরোর কাজে এমন কিছু বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে যা অনেক চিন্তকদের আলোচনায় স্থান পায়নি। আবার তা অনেকেই স্বেচ্ছায় চেপে গেছেন। বিশেষ বিশেষ ঘটনা এমনঃ কিছু চিন্তক শ্রেনীর মানুষ প্রচলিত শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্বে কোন কথাই বলতে চায়নি। বরং অন্দ্বের মত অনুসরণ করেছেন। চিন্তকদেরকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, এবং বিতর্ককে দমন করা হয়েছে। আর এর ফলেই দিনে দিনে এক মহা বিপর্যয়ের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্পেরো অনেক ক্ষেত্রে ভালো ও মন্দ্ব পরিবেশের পার্থকই নিরূপন করতে পারেননি। তবে স্পেরো চেষ্টা করেছে বাস্তব সম্মত পরিস্থির উপস্থানে। স্পেরো দুই ধরনের চিন্তকের কথা বলেছেন, যাদের মধ্যে কারো কথা একেবারে গুরুত্ব দেয়নি। আবার দ্বিমতের কারনে অনেককেই উচু মূল্য দিতে হয়েছে।

মা ইনচু ও জনসংখ্যা তত্ত্ব


স্পেরোর বর্ননায় গুরুত্ব সহকারে মা ইনচুর বিষয় টি বর্ননা করা হয়েছে। মা ইনচু চীনের বিপ্লবী ভাবধারার একজন বিখ্যাত চিন্তক ছিলেন। তিনি স্নাতকোত্তর করেন ইয়াল বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে । এর পর তিনি কলম্বিয়া বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও দর্শনে ডিগ্রী অর্জন করেন। সেই বিশ্ব বিদ্যালয় মা ইনচুকে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দানের কথা বললে তিনি তা গ্রহন না করে চীনের একজন দেশ প্রেমিক লোক হিসাবে সামাজিক পরিবর্তনের আন্দোলনে এসে ১৯১৬ সালে যোগদান করেন। সেই সময়ে তিনি জিবিকার তাগিদে বেইজিং বিশ্ব বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে চেয়ারম্যান হিসাবে যোগদান করেন। তিনি ব্যাংকের উপদেশক হিসাবে ও কাজ করেন। ১৯২৮ সালে তিনি চিয়াং কাইশেক সরকারের অর্থনীতি ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ১৯৩৭ সালে জাপান চীন আক্রমণ করলে তিনি সেখান থেকে চাংগিং পালিয়ে আসেন। চাংগিং এ এসে তিনি একটি অর্থনৈতিক ও বানিজ্যিক প্রতিস্টানের সভাপতি নির্বাচিত হন। সেই খানেই চৌ এন লাইয়ের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে এবং নিজেকে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসাবে তৈরী করেন। ঘটনা ক্রমে চিয়াং কাইশেক মা ইনচু কে কউমিন্টাং এর সমালোচনার অভিযোগে গ্রেফতার করে। ফলে তাকে অত্যন্ত কষ্ট দায়ক অবস্থায় গিজু ক্যাম্পে আটক থাকতে হয়। পরে থাকে সাংরাউ ক্যাম্পে প্রেরন করা হয়। অবশেষে চৌ এন লাই ও কিছু মার্কিন বন্দ্বুদের সহায়তায় তিনি মুক্তি পান। তিনি কউমিন্টাং ও কমিউনিস্টদের লড়াইয়ে তিনি আহত হয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি প্রকাশ্যেই সকলকে আহবান করছিলেন কউমিন্টাং থেকে বেড়িয়ে আসার জন্য । কয়েক বছরে তিনি অনেক গুলো সরকারী পদে অধিস্টিত ছিলেন। ১৯৫১ সালে তিনি বেইজিং বিশ্ব বিদ্যালয়ের সভাপতি ছিলেন। কমিউনিস্টদের বিজয়ের পর তিনিই ছিলেন বিরোধী চিন্তার মানুষ যিনি উচু পদে আসিন হয়েছিলেন। তিনি সরকারের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি জাতীয় কংগ্রেসের ও সদস্য ছিলেন। স্পেরোর মতে, তিনি ছিলেন একজন মুক্ত চিন্তার ও নৈতিক চেতনার বলিষ্ঠ ব্যাক্তিত্ব। তিনি অত্যন্ত সহজ, সরল ভাষায় কথা বলতেন। তিনি স্লোগান ধর্মী কথায় বিশ্বাসী ছিলেন না । কল্পনা বিলাসী ভাবনা তাঁর ছিলো না । (৩৭-৩৯) এটা ছিলো সেই সময় যখন চীনে চলছিলো শত ফুল ফোটানোর আন্দোলন। চিন সংস্কৃতির উপর তখন নিজস্ব নিয়ন্ত্রন অনেকটাই শিতিল করে দিয়েছে। ফলে মা ইনচু খুব সহজেই তাঁর জনসঙ্খ্যা তত্ত্ব হাজির করতে পেরেছিলেনঃ


“ অনেক প্রশ্ন নিয়ে আলোচনার সাহস আমাদের ছিলো না। আমরা আলোচনা করতে পারি নাই, তবে এখন তা আলোচনা করা সম্ভব। আমি এখন আপনাদের সামনে জনসংখ্যার বিষয়টি রাখতে চাই। ইহা হলো ফুল ফোটার বসন্ত, তাই এখন সকলেই এই বিষয়ে মুক্ত ভাবে আলোচনা করতে পারেন। চাইলে ভিন্ন মত ও পোষন করতে পারেন”। (৩৯)


১৯৫৭ সালে তিনি তাঁর জনসংখ্যা তত্ত্ব প্রবল বাধার মধ্যেও উপস্থাপন করেন । স্পেরুর মতে, চীনের গোঁড়া কমিউনিস্টরা উত্তরাধিকার সূত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের তত্ত্ব মেনে চলতেন। তাদের মতামত ছিলো জন সংখ্যা কোন সমস্যাই নয়। মা ইনচু এই মতামতকে ডগমা হিসাবে বাতিল করে দেন। (৪০) স্পেরো মা ইনচুর মতামতকে এই সারসংক্ষেপ করেনঃ


“ মা’র তত্ত্ব ছিলো অধিক জনসংখ্যা চীনের উন্নয়ন ধারাকে বাঁধা গ্রস্থ করবে। তিনি এই বিষয়ে বেশ কিছু কার্যক্রম গ্রহনের জন্য প্রস্তাব করেন। যেমন – পরিবার পরিকল্পনা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনের জন্য শিক্ষার কথা বলেন, দেরী করে বিবাহ, ছোট পরিবারের জন্য পুরস্কার দেয়ার কথা বলেন, বড় পরিবারের বিরুদ্বে ব্যবস্থার কথা ও বলেন, তিনি জন্ম নিয়ন্ত্রনের জন্য নানা প্রকার ঔষধ ব্যবহারের প্রস্তবান দেন। তিনি জনসংখ্যার নিয়ন্ত্রনকে সিমীত সম্পদের ব্যবস্থাপনার জন্য বিকল্প ভাবতে থাকেন। তিনি অধিক জনসংখ্যার বিরুদ্বে জনগণকে হুঁশিয়ার করে দেন। তিনি পরিকল্পিত উন্নয়নের শর্ত হিসাবে পরিকল্পিত জনসংখ্যার কথা বলেন। তিনি ম্যালতাসিয়ান মতবাদের সাথে সংগতি রেখে বিজ্ঞান সম্মত পন্থায় জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্বতি ব্যবহারের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। জনসংখ্যার নিয়ন্ত্রন ইশ্বেরে্র ইচ্ছার বিরোধী হিসাবে পাল্টা বক্তব্য প্রদানের পর ও তিনি নারীদের গর্ভপাতের বিরোধিতা করেন। ‘ তিনি বৃহত্তর পরিসরে জন্ম নিয়ন্ত্রনের কথা বললেও গর্ভপাতের প্রবল বিরুধিতা করেন’ । তিনি আরো যে বিষয়টির উপর গুরুত্ব দেন তা হলো ভূমির সঠিক ব্যবহার…, তিনি বলেন কেবল ভূমির ব্যবহার করেই চীনের মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন এখন পর্যন্ত চীন তাঁর পাহাড়ি অঞ্চলের ভূমির ব্যবহার করতে পারছে না । এই গুলো হয়ত শুষ্ক বা আদিবাসীদের দখলে চলে গেছে। তাতে তারা গরুর খাদ্য উৎপাদন ছাড়া আরা কিছুই করতে পারছে না – তাই সত্যিকার ভাবে সেই সকল ভূমিকে কোন দিনই ব্যবহার করা সম্ভব নয়”। (৪০-৪১) মাওসেতুং সেই সময়ে মা ইনচুর চিন্তা ধারাকে প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “ জনসংখ্যার বিষয়টি আমাদের পরিকল্পনায় গ্রহন করা উচিৎ এবং তার বিষয়ে আরো গবেষণা চালানো দরকার। তিনি বলেন, মা ইনচু খুব চমৎকার প্রস্তাব দিয়েছেন”।(৪২) তবে মা ইনচু মাওয়ের ও বিরুধিতা করেছিলেন। স্পেরোর মতে, শত ফুল ফোটানোর আন্দোলনে ডানপন্থার বিরোধী চক্র সুযোগ করে নেয়। তারা সাদা – কালোর ইস্যূকে নিজেদের প্রাচারে ব্যবহার করতে থাকে। জনসংখ্যার সামগ্রীক আন্দোলনই পরিচালিত হত ম্যালতুসিয়ান তত্ত্বানুসারেঃ


“ ‘ ম্যালতাস বলেছেন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন কর, অন্য দিকে মার্ক্সবাদ বলেছে জনসঙ্খ্যা বাড়াও’। মাধ্যমিক স্থরের স্কুল গুলোতে পড়ানো হয়েছে ম্যালতাস হলেন একজন প্রতিক্রিয়াশীল কেননা তিনি উৎপাদন ও জনসংখ্যার মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব দেখানোর চেষ্টা করেছেন। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই ধরনের দ্বন্দ্বের কোন অবকাশ নাই, ( তা কেবল পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বা অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থাই থাকতে পারে-অনুবাদক) মা ইনচুকে একজন ‘বিপদজনক ম্যালতুষিয়ান’ হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং ‘মার্ক্সবাদ- লেনিনবাদ’ ও পার্টির আজীবন বিরোধী ব্যক্তি হিসাবে চিহ্নিত হয়েছেন’ ”। (৪০)


১৯৫৮ সালে, মাওসেতুং বলেন, “ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বকে বিষয়টি অতিব গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে দেখতে হবে কেননা ৬০০ মিলিয়ন মানুষের মাঝে বিষয়টি নিয়ে তিব্র বিরোধ চলছে”।(৪১-৪২) জনগন ও দেখল মা ইনচু র চিন্তা ধারা চীনকে সাম্যবাদি ও মাওবাদি ধারা থেকে বিচ্যুত করে দিচ্ছে । মাওয়ের বিশ্বস্থ সম্পাদক চেন বুধা লিখলেন মা ইনচু ১৯৫৮ সালের ৪ঠা মের বক্তৃতা থেকে বিচ্যুত হয়ে জন সংখ্যা তত্ত্বের বিষয়টি কে বিতর্কিত করে দিচ্ছেন। লুইসুখী মতামত দিলেন, মাওবাদকে বিতর্কিত করে মা ইনচু মানুষকে কেবল একজন ভোগ কারী হিসাবে বিবেচনায় নিচ্ছেন । আসলে মানুষ কেবল খায় না সে উৎপাদন ও করে থাকে । সেই সময়ে জাতীয় পর্যায়ের বিশ্ব বিদ্যালয় ও পত্র পত্রিকায় মা ইনচুর তত্ত্বের ব্যাপক সমালোচনা হয় । জাতীয় ভাবে তা প্রতিরোধের ও উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৯৫৯ সালে ডান পন্থীরা ও এই আন্দোলনে সরিক হয়েছিলো। সেই পরিস্থিতিতে মা ইনচু নিজে ও তাঁর বিরুদ্বে লিখা কিছু নিবন্দ্বের সাথে একমত ও পোষন করেন। তবে তিনি তাঁর নিজের মতামত থেকে সড়ে আসতে পা্রেন নাই । তিনি বলেন, “আমি ই সত্যের উপর আছি। থাকে সড়ে আসার কোন অবকাশ নেই। তাঁর জন্য আমি মরতে ও রাজি আছি”। (৪২) কেননা জন সংখ্যা বৃদ্বি চীনের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। কেং সাং মাওবাদিদের “একজন বিখ্যাত নিরাপত্তা বিষয়ক নেতা ছিলেন”। তিনি চিনের বিভিন্ন বিশ্ব বিদ্যালয় গুলোতে মা ইনচু তত্ত্বের সমালোচনা করার জন্য ১৯৫৯ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সকল চেষ্টা চালান। প্রায় ১০,০০০ “নানা প্রকারের পোস্টার” তাঁর বিরুদ্বে চাপা হয়। ৮২ টি প্রবন্দ্ব প্রকাশ করা হয়। (৪১-৪২) এক ছাত্র সেই পরিস্থিতি এই ভাবে বর্ননা করেনঃ


“ আমরা তাঁর বিরুদ্বে লিখা গুলো কপি করেছি, পোস্টার গুলো কপি করেছি, অন্যান্য উপকরন গুলো সংগ্রহ করে প্রচারের ব্যবস্থা করেছি। আমি নিজে একটা পোস্টারে লিখেছিলাম, ‘ চেয়ারম্যান মাও বলেছেন মানুষ বহু সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায় । তারা চাইলে অনেক কিছু করতে পারেন। কিন্তু মা ইনচু কেবল মানুষের মুখ দেখেন তিনি তাদের এক জোড়া হাত দেখেন না’। তিনি বিশ্ব বিদ্যালয় সমূহে নানা সমালোচনার মুখে তেমন কিছু বলতেই পারতেন না । কোন কোন সময় তিনি কেবল বলেই শেষ করতে আর কাঊকেই কিছু বলতে দিতেন না”। (৪৩)

তিনি কিছু সহজ জবাব দেবার চেষ্টা করতেন। তিনি বলতেন প্রতিটি মুখের সাথে দু টি হাত থাকলে ও দুনিয়ার সকল কিছু সীমাহীন নয়, এটা কোন জাদুকরী কেনভাস নয় – সেখানে আপনি ইচ্ছেমত ছবি আকতে পারবেন। বেশী হাত হলেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এমন নয়। মানুষকে একটি সীমাবদ্বতার ভেতর থেকেই কাজ করতে হয়। এটা সত্য কথা – মা ইনচু কোন দিনই সত্য কথা শোনতে চায়নি। তবে এটা সত্যি কথা মা ইনচু ম্যালথাসের সাথে সকল বিষয়ে একমত ছিলেন না, তিনি বরং তাঁর সমালোচনা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত সমালোচনা গুলো হলোঃ ম্যালথাস গুরুতর ভুল করেছেন তাঁর জন সংখ্যা ও খাদ্য উৎপাদনের রেশিও বিভাজনে। ম্যালতাস কোন দিন ই প্রকৌশল ও বিজ্ঞানের অবদানকে বিবেচনায় আনেন নি । তিনি বলেছিলেন, মানুষ বাড়ে জ্যামিতিক হারে আরে জন সংখ্যা বাড়ে গানিতিক হারে । আসল সূত্র হলো বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের ফলে খাদ্য ও উৎপাদিত হয় গানিতিক হারে । ম্যালথাস বলেছলেন, মানুষের জীবন মানের উপর ভিত্তি করে জনসংখ্যার নিয়ন্ত্রন করা হবে । মা ইনচু ম্যালথাচের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেন যে কর্মজীবী মানুষ দরিদ্র থেকে যায় জনসংখ্যা অনুসারে খাদ্য বন্টন না করার কারনে । এছাড়া, শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরা দরিদ্র হয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বসবাস করার কারনে । স্পেরো উল্লেখ করেছিলেন, ম্যালতাসের মতে খাদ্যের অভাব এবং মানুষের পারস্পরিক লড়াই জনসংখ্যার নিয়ন্ত্রক হিসাবে কাজ করে। মা ইনচু আরো বলেছিলেন, ম্যালথাস নৈতিক ভাবে দুর্বল তত্ত্ব হাজির করেছিলেন। মা ইনচু প্রথাগত কন্ট্রাসেপশনের বিরোধী ছিলেন। তবে তিনি বৈজ্ঞানিক পন্থার বিরোধী ছিলেন না । ১৯৬০ সালের ৪ জানুয়ারী বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ থেকে অপসারিত হন। ১৯৬২ সালে তাকে সর্ব শেষ জাতীয় কংগ্রেসের সভায় দেখা গেছে । জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি তাঁর নিজস্ব গবেষণা কর্মে নিবিড় ভাবে নিমগ্ন হয়ে পড়েন। তবে, যখন সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হলো, ভয়ে তিনি তাঁর সকল গবেষণা কর্ম পুড়িয়ে ফেলেন। জানা যায় তাতে তিনি চিনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ে বেশ কিছু বিষয় উদ্ভাবন করেছিলেন। পরে ১৯৭৯ সালে তিনি দেং শাসন কালে ৯৮ বছর বয়সে তাকে উচু পদে আসিন করা হয়। “ভুল সিদ্বান্তের বিরুদ্বে” পুজিবাদিরা প্রতিবিপ্লবের কাজে ব্যবহার করে। তিনি মাওবাদের নানা প্রকার ভুল বেড় করে সত্য অসত্য মিশিয়ে প্রচারনার কাজ করতে থাকেন। সেই সময়ে তাকে বেইজিং বিশ্ব বিদ্যালয়ের সম্মানিত সভাপতি করা হয়। তাঁর নয়া জনমিতিক তত্ত্ব প্রকাশিত হয়। তিনি ১৯৮২ সালে ১০ই মে মারা যান । তাঁর নিজস্ব শহরে তাঁর কাজের একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে শিরোনাম করা হয়, “ ইতিহাসের শিক্ষাঃ ‘ মানুষকে নিরুতসাহিত কর তারা যেন অতিরিক্ত সন্তান জন্ম না দেন”। স্পেরো উপসংহার টানেন এই বলে, “ মা ইনচু বিশ্বাস করতেন চিনের কমিউনিস্ট পার্টিই হলো সেই দেশের সকল আশা ভরসার স্থল। মাও নিজে এবং পার্টি তাকে একজন মহান বুদ্বিজিবী হিসাবে গ্রহন করেন”। (৪২-৪৫) সেই সূত্র ধরে ১৯৭৯ সালে চীনে এক সন্তান নীতি গ্রহন করা হয়েছিলো। সেই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিলো উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে জন্ম নিয়ন্ত্রন করতে হবে। এই নীতির বিরুদ্বে কিছুই গ্রহন করা হবে না । কেহ এই নীতির বিরুদ্বে গেলে তাকে নানা প্রকার শাস্তি ভোগ করতে হবে । ধারনা করা হয় চীনে এই নীতির কারনে ১০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন জন্ম রোধ করা হয়েছে। ফলে আজ চীনে লিং ভিত্তিক অসাম্য দেখা দিয়েছে। সেখানে এখন ছেলে মেয়ের রেশিও দেখা যাচ্ছে ১১৭ঃ১০০ । এটা ২০০০ সালের হিসাব। চীন এখন একটি পুঁজিবাদী, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ হিসাবে পরিচিত। সেখানে এখন মুনাফা, উন্নয়ন ও স্থায়িত্বের বাহিরে কিছু ভাবা হয় না । সেখানে নারীদের উন্নয়ন বা তাদের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলার সময় নেই। সামগ্রীক ভাবে সেখানকার ক্ষমতাশীন দল টি নিজেদের দেশকে কনফুসিয়ান চিন্তা ধারা দিয়ে ঢেকে দিয়েছে । সেখানে নারীদেরকে বিকশিত হবার কথা ভাবার অবকাশ নেই । অথচ সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় অধিকতর কার্যকর জনসঙ্খ্যা ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম গ্রহন করা হয়েছিলো। সেই সময়ে কেবল স্থায়িত্ব বা উন্নয়নের কথা ভাবা হত না – সেখানে প্রধানত দেখা হত মানুষ মানুষের উপর কোন প্রকার নিপিড়ন করছে কি না । সেখানে পিতৃতান্ত্রিক নিপিড়নের কোন প্রকার স্থান ছিলো না । মাওবাদি চিন্তাধারায় মানুষের সত্যিকার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হত। সেই সময়েই শ্লোগান উঠেছিলোঃ “ নারীরা আকাশের অর্ধস্থান দখল করে আছেন!”

হিউ ওয়ানলাই এবং সানমেনচিয়া প্রসংগ

১৯১১ ইংরেজী সালে হিউ ওয়ানলাই সাঙ্গহাইতে জন্ম গ্রহন করেন।তিনি শিক্ষার উদ্দেশ্যেই মার্কিন মুলুক ভ্রমনে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি প্রথমে কর্নেল এবং পরে আইওয়া বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়া লিখা করেন। তিনি নরিস বাঁধে টেনাসী ভ্যালী কর্তৃপক্ষের অধীনে প্রকৌশলী হিসাবে কাজ করেন। সেখান তিনি অর্বানায় ইলিয়নস বিশ্ব বিদ্যালয়ে পি এইচ ডি ডিগ্রী অর্জন করেন। গ্রাজুয়েশন করার সময় তিনি আমেরিকার বাধ সমূহের উপর ব্যাপক শিক্ষা লাভ করেন। এর পর তিনি চীনে ফিরে আসেন এবং সেই অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা নিজ দেশে হাইড্রোলিক ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজে লাগান। তখন সরকার তাকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন কাজে নিয়োগ দেন। জাপানীদের আক্রমনের সময় তিনি পলায়ন করেন। তবে যখন কমিউনিস্ট পার্টি চীনের ক্ষমতায় আসেন তখন দেশের দক্ষিনাঞ্চলের নদী সমূহের ব্যবহারে দায়িত্ব তাঁর উপর বর্তায়। পরে ১৯৫৩ সালে তাকে কিং হূয়া বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রফেসর হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয় । তিনি সেখানে হাইড্রোলিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে শিক্ষা দেন। তিনি সেই সময়ে চীনের নদী সমূহের উপর ব্যাপক জরিপ কার্য পরিচালনা করেন। (৫১-৫২)

চীনের নদী সমূহের পানির উপর নিয়ন্ত্রন কায়েম করা মাওয়ের একটি স্বপ্ন ছিলো। গ্রেট লিপের সময় চীনের নদি শাসন কর্মসূচি ছিলো অন্যতম। ১৯৫০ সালের মাঝা মাঝি সময়ে হিউয়াং ওয়ানলি ইয়ালো নদীর উপর সানমেনচিয়া বাধ নির্মানের পরিকল্পনা প্রনয়ন করেন। ১৯৫৭ সালে হিউয়াং ওয়ানলি প্রায় ৭০ জন বিশেষজ্ঞ নিয়ে একটি সভার আয়োজন করেন। তাকে সেই সময়ে, “ প্রকৃতিক নিয়ম-বিধি বিরোধী হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়”। (৫২) সেই সময়ে সৌভিয়েত বিজ্ঞানীরা ও তাঁর উপর চাপ দিচ্ছিলেন এবং অন্যান্যরা ও এর প্রবল বিরুধিতা করছিলেন কিন্তু হিউয়াং ওয়ানলি তাঁর পরিকল্পনা থেকে ফিরে আসেননি। তিনি তখন একটি রূপক গল্প কিং হোয়া বিশ্ব বিদ্যালয়ের জার্নালে প্রকাশ করলেন। তিনি সেই গল্পে দলীয় কর্মী ও অন্যান্যদের অজ্ঞানতার সমালোচনা করলেন। ওয়ানলি কেবল জননেতাদেরকে টার্গেট করে বিষয়টি বুঝাবার প্রায়াস নিলেন। তিনি জননেতাদের ছদ্ম নাম দিয়ে তাদের বাস্তব জীবনের চিত্রে সেই গল্পে ফুটিয়ে তুললেন। চীনের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সেই গল্পে স্থান পায়। স্পেরো লিখেছেন হিউয়াং ওয়ানলি যাদের উদ্দেশ্য করে লিকেছিলেন তারা সামগ্রীক বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসাবে গ্রহন করে দেশের মানুষের জন্য যা যা পরিবর্তন করা দরকার তাঁর জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। উপরন্ত, আমেরিকা তাঁর এই উদ্যোগের প্রশংসা করলেন। সেই কারনে তা মার্কিন দেশের রাষ্ট্র প্রধান পরিবর্তনে ও ভূমিকা রাখে। তিনি মা ইনচুর কথা ও তাঁর লিখায় উল্লেখ করেন। হিউয়াং ওয়ানলি বললেন, চিন যখন পরিবার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছিল তখন রাস্ট্রীয় যন্ত্রের মনোভাব ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনে রাখতে সচেস্ট ছিলো। কিন্তু মেরুদন্ডহীন ও অজ্ঞ প্রশাসকদের কারনে মা ইনচুর সকল মেধা বিনস্ট হয়ে গিয়েছে। (৫২-৫৩) সেই গল্পটি তাঁর সকল সমস্যার কারন হিসাবে বিশাল ভূমিকা রাখে।


৮ই জুন ১৯৫৭ সালে পিপলস ডেইলী পত্রিকায় হিউয়াং ওয়ানলিকে মারাত্মক আক্রমণ করে


এক প্রবন্দ্ব চাপা হয়। মাওসেতুং সয়ং সেই প্রবন্দ্বের সাথে সুর মিলিয়ে বলেন, “ এসব কি রাবিশ”? আর সেইটাই ছিলো ডানপন্থার বিরুদ্বে লড়াইয়ের সূচনা । স্পেরোর মতে হিউয়াং ওয়ানলির বিরুদ্বে প্রায় ১০ টি বড় ধরনের অভিযোগ আনা হয়। আর সেই গুলো ছিলোঃ তিনি মাওকে আক্রমণ করেছেন, তিনি বিদেশীদের প্রতি অনুরক্ত তাকে “প্রতিক্রিয়াশীল”- হিসাবে বলা হয়, তিনি সাধারন জনগণ ও পার্টির মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন, তিনি বুর্জোয়া গণতন্ত্রের পুজারী, বলা হয় এই বুদ্বিজীবীরা বিজ্ঞান ভিত্তিক চীন গঠনের অন্তরায়, এবং তিনি নাকি চীনের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন কর্মসূচির সমালোচক ইত্যাদি। তাঁর বিরুদ্বে আরো বড় দোষারোপ করা হয় যে তিনি সানমেনচিয়া বাঁধ চান না । তাকে বিশ্ব বিদ্যালয়ে নিন্দা করা হয় এমন কি শিক্ষকতা থেকে তাকে বাদ দেয়া হয়। প্রতি মাসে তাঁর বেতন ২৮৯ থেকে ২০৭ ইয়ানে কমিয়ে দেয়া হয়। অধিকন্ত তাকে শ্রমিক শ্রেনীতে নামিয়ে দেয়া হয়। মি ইয়ান রিজার্ভারে নির্মান কার্মে যোগ দিতে বলা হয়। মাও দৃশ্যত এক সময় তাঁর প্রতি দয়াশীল ছিলেন। মাও চাইতেন তিনি দ্বিতীয় সুযোগ পাক , এতে তিনি হয়ত শোধরে যেতে পারেন । আর তাকে বলা হোক তিনি নিজে সমালোচনা করে ডানপন্থা ত্যাগ করুন। আর তিনি যেন বাঁধ নির্মানের বিরুদ্বে কথা না বলেন। তিনি কেন একা সত্যি কথা বলবেন। মাওয়ের নিকট জবাব দিতে বলা হয়।

সানমেনচিয়া-বাধ


ডানপন্থার বদনাম কেবল হিউইয়াং ওয়ানলির উপরই নয়, তাঁর পরিবারে উপর ও অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে। তাঁর সন্তানদের জন্য সকল দরজা বন্দ্ব করে দেয়া হয় কারন তা নাকি “ ছোট ডানপন্থী”,। তাদেরকে বিদ্যালয় থেকে বেড় করে দেয়া হয়। পিতার সাথে সম্পর্কের কারনের অন্য একজন সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি করেনি। হিউয়াং ওয়ানলির মেয়ে লিখেছেন, রেড গার্ডের লোকেরা তাদের ঘর বাড়ী তছনছ করে দেয়। তাদেরকে বুর্জোয়া আখ্যায়িত করে নানা ভাবে অপমানিত করেঃ(৫৩-৫৫)
“ তারা আমাদের আলমিরা, বাক্স ও ওর্ড্ড্রোভ থেকে সকল মূল্যবান দ্রব্য নিয়ে যায় আর সাধারন কাপড় ছোপড় মেঝে ছুড়ে ফেলে দেয়। তারা আমাদের পুরাতন সকল এ্যালবাম নিয়ে নেয়। তা থেকে আমাদেরকে প্রমান করতে চান যে আমরা প্রতিবিপ্লবী । তারা দামী বই, স্বর্ণ, এমন কি আমাদের সংগৃহীত স্টেম্প গুলো ও নিয়ে নেয়। আমরা কোন দিন জানতে পারিনি তা দিয়ে তারা কি করেছেন। তারা এর পর দিন পত্রিকায় শিরোনাম করে একজন বড় মাপের ডান পন্থী হিউয়াং ওয়ানলির বাড়ীতে তল্লাশী চালানো হয়েছে। তারা কয়েক বার এসেছেন, আমরা তাদের সামনে গিয়ে কথা বলতে সাহস পাইনি। সেই অবস্থাটা আমাদের জন্য ছিলো খুবই ভয়ঙ্কর” । (৫৬)

আরো একদিনের কথা, রেড গার্ডের লোকেরা আমাদের রাতের খাবারের সময়ে বাসায় আসে। এরা এসেই আমাদের বাবা হিউয়াং ওয়ানলিকে নানা কুৎসিত ভাষায় গালি গালাজ করতে থাকে । তাকে প্রথমে দাড় করিয়ে উচ্চ বে্তন নেবার জন্য বকাবকি করে। “এরা আমার বাবাকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করে। তারা চিৎকার করে বাবার কাছে বেতনের টাকা ফেরত চায়। একজন ডান পন্থীর নাকি এত বেতন নেয়া ঠিক হয়নি”। (৫৭) স্পেরো কিন্তু তাঁর লিখায় পুরো বিষয়টি তাঁর পাঠকদের সামনে প্রাকাশ করেন নাই। তিনি কেবল মাওসেতুং এর দৃষ্টি ভঙ্গীকে দেখানোর প্রায়স পেয়েছেন। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনার সময় একটি কথা জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো আর তা হলোঃ


“ পিতা যদি নায়ক হন, তবে ছেলে হবে ভালো;
আর যদি পিতা হয় প্রতিক্রিয়াশীল, তবে ছেলে হবে কুত্তার বাচ্চা”।


প্রথম দিকে যে সকল রেড গার্ড হয়েছিল, এরা প্রধানত মাওবাদের বিপরীত ধারার ছিলেন, তাদেরকে গড়ে তুলার পিছনে রক্ত ধারার বংশীয় তত্ত্ব কাজ করেছিলো। এদের অনেকেই সাবেক আমলা শ্রেনীর পরিবার থেকে আসা। তাদের লক্ষ্য ছিলো তাদের পিতাদের রাজনীতি ও সামাজিক অবস্থান বজায় রাখা। প্রকৃত মাওবাদিগন এই ধারা রাজনীতির বিরুধিতা করেছিলেন। মাও নিজে এবং লিন পিয়াং এই লোকদেখানো রাজনীতির চরম বিরুধিতা করেন। মাওয়ের স্ত্রী জিয়াং কিং ও এর প্রবল বিরুধিতা করে বক্তব্য রাখেন। ফলে একটা বিরুধের সূচনা হয়। সেই বিরুধকে বলা হয় “রাজকীয়” এবং “রক্ষণশীলতার” বিরুধ। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কালে তা একটি গুরুত্বপূর্ন ইস্যূতে পরিনত হয়। আমাদের কাছে যা তথ্য আছে সেই অনুসারে দেখা যায় হিউয়াং ওয়ানলী এবং রেড গার্ডের বিতর্ক মাওয়ের বিপরীতে দেখা যায়। স্পেরোর লিখায় দেখা গেল মূল দোষী হলে মাও ই । মাওবাদিদের লড়াই একাডেমিক ও জনতার আন্দোলনের মধ্যেই সিমাবদ্ব ছিলো। ইহা ছিলো রাজনৈতিক । তা পারিবারিক ও অর্থনৈতিক ছিলো না । সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা কালে মাওবাদিরা ও সমালোচনার সম্মোখিন হয় “ অনেককে আক্রমণ কর (নিচু স্তরের) স্বল্পকে বাঁচানোর জন্য (উপরের স্তরের)”। মাওবাদিরা ব্যাপক সংগ্রাম গড়ে তুলে সেই সকল লোকদের বিরুদ্বে যারা পুঁজিবাদের পথে এগিয়ে চলেছে। তাদেরকে “ক্ষমতা থেকে ছুড়ে ফেলতে চায়”। হিউয়াং ওয়ানলী ও তাঁর পরিবারের লোকেরা নানা দিক থেকে দূর্ভোগে পরে তাদেরকে রক্ত ধারার অপরাধ তত্ত্ব থেকে বাঁচানোর জন্য উদ্যোগ গ্রহন করা হয়।

১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ক্যাডার স্কুলে হিউয়াং ওয়ানলীকে রাজনৈতিক এবং শ্রমজীবীদের কাজের সংস্কারের জন্য প্রেরন করা হয়। মাওয়ের মৃত্যুর পর তিনি আবার পুনর্বাসিত হন। তিনি আবার তাঁর আগের মতই রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার সমালোচনা করতে থাকেন। ৬২ বছর বয়সে তিনি নদী শাসনের সমালোচনায় বলেন, দক্ষিন দিক থেকে উত্তরের দিকে পানি প্রবাহ চালিত করলে যে সকল সুবিধা হবে তাঁর চেয়ে বরং নতুন চ্যানেল তৈরী করে সেই প্রবাহ চালু করলে বেশী সুবিধা হবে । (৫৭-৫৮) হিউয়াং ওয়ানলী তাঁর আত্মজীবনীতে তা লিপিবদ্ব করেনঃ
“ আমি নিজে যা করেছি তাঁর জন্য কোন ভাবেই অনুতপ্ত নই। তারা নিজেরাই জানেন তারা ভূল পথে আছেন। সরকারের সাথে আছেন বলেই তারা আমার নিন্দা করেছেন। তারা চাইছিলো সোভিয়েত যেন কোন ভাবেই ভূল প্রমানিত না হয়। তাই তাদের চেষ্টা ছিলো আমার কাজ কে কমিউনিস্ট বিরোধী বা বিপ্লব বিরোধী হিসাবে দাড় করানো। আর অনেকের তো মেরুদন্ডই নেই। আমি নিশ্চিত ছিলেম তাদের সমস্যা হবেই। কিন্তু তাদের কারো আমার সাথে একমত পোষণ করার সাহস ছিলো না । এটা পরিস্কার ছিলো আমি ১৯৬৪ সালের প্রথম দিক থেকেই সঠিক ছিলাম। দু বছর পর তাদের বাঁধ টি নির্মান কাজ সম্পূর্ন শেষ হয়। তখনই একটি শহর কাদার কারনে পানির নিচে তলিয় যায়। এখন ওরা তাঁর জন্য ক্ষমা প্রাথর্না করছেন। মাও নিজেই এর জন্য দায়ী। তাঁর কারনেই আমার গায়ে ডান পন্থার লেভেল এঁটে দেয়া হয়েছিলো। তিনি শিক্ষা দিতেন মানুষ ঐক্যবদ্ব হলেই সমাজের উন্নয়ন হবে। কিন্তু তিনি তা স্বীকার করতেন না যে মানুষা আসলে আত্মকেন্দ্রিক প্রানী। আর তিনি ছিলেন একটু বেশী আত্মকেন্দ্রীক…(৫৮-৫৯)

স্পেরোর মতে, হিউয়াং ওয়ানলী বুঝতে পেরেছিলেন, কেন্দ্রিয় নদীর গতিপথ আটকে দিলে প্রকৃতির উপর বিরোপ প্রভাব পড়বে স্পেরোর ভাষ্যঃ

“ তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন যে, ইয়াল নদীর নিম্নান অঞ্চল পলি পড়ে নানা জায়গা শুকিয়ে যাবে । তাঁর কথা ছিলো সুইচ গেইট নির্মান করে সময়ে সময়ে বালির স্তরকে নিস্কাশনের ব্যবস্থা করে নদীর তল দেশ পরিস্কার করতে হবে। এই কাজ চীন করলে রাশিয়া সমালোচনা হতে পারে এই ভয়ে তারা তা করতে চায় নি। উপরুন্ত মহান নেতার ভবিষ্যৎ বানীর কিছু ব্যাতিক্রম করতে হয়। হিউ ‘র বক্তব্য ছিলো রাজনৈতিক নেতা বিরুধিতা। তাই তাকে বিচার করে শাস্তি দেয়া হয়”।(৬২)


স্পেরো তাঁর প্রতিবেদনে বলেন সানমেনচিয়া বাঁধ নির্মানের ফলে ওয়ানলীর ভবিষ্যৎ বানীর চেয়ে ও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রায় ২৮০,০০০ কৃষক সাঙ্গহাই ও হেনান থেকে তাদের উর্ভর ভূমি ও বাপ-দাদার ভিটা মাটি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। তাদেরকে নিঞ্জিয়া ও গানসু এলাকায় অনুর্ভর এলাকায় পুনর্বাসন করা হয় । ৭৫০,০০ মিউ উর্ভর ভূমি, দুইটি কাউন্টি, ২১ টি শহর এবং ২৫৩ টি গ্রাম পানির নিচে সম্পূর্ন তালিয়ে যায়। (৬১) সানমেনচিয়া বাঁধ হিউ’র ভবিষ্যৎ বানীর সময়ে আগেই পলি পরে মরুভূমিতে পরিনত হয়। তার মূল পরিকল্পনায় ছিলো মাত্র ১০ মিলিয়ন ইয়ান খরচ করে সইস গেইটের ব্যবস্থা রাখলে সেই পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব ছিলো। ফলে অনেক শিল্প এলাকা ও গ্রাম নগর বেঁচে যেত। এই সকল পদক্ষেপের কারনে স্থানীয় উৎপাদন ও পরিবেশ মারাত্মক ভাবে ক্ষতি গ্রস্থ হয়। ১৯৬২ সালে সেই বাধটি নতুন ভাবে পরিকল্পনা করা হয়, কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। বহু খরচ পাতি করার পর সেই বাধের স্থান পরিবর্তন করে নেয় কতৃপক্ষ। মাও নিজেই পরে বললেন এটা আমাদের জন্য বিপদ ডেকে এনেছে । তা সড়ানোর জন্য চৌ এন লাই কে নির্দেশ দেন। যদি বিকল্প কিছু না করা যায় “তবে বাধটি বোমা মেরে উড়িয়ে দেবার কথা ও বললেন তিনি” । বাঁধ পুনঃ নির্মান করা হলো । আবার ১৯৬৯ সালে জিয়াং শহর তলিয়ে গেল। যে বাঁধ নির্মান করা হয়ে ছিলো বিদ্যুৎ উতপাদন ও বন্যা নিয়ন্ত্রনের জন্য তা কেটে দেয়া হলো। মাওয়ের যুগে, সংশোধন বাদের যুগে এমন কি ২০০০ সালে ও রাজনৈতিক কারনে কর্তা ব্যাক্তিরা এই বাঁধ প্রকল্পের কোন প্রকার নিন্দাবাদ করেন নাই। (৬২-৬৩) কেননা এটাই যে ছিলো হুয়াং ওয়ানলীর ভাগ্য । বিজ্ঞানের পক্ষে রাজনীতিকে বিরুধীতা করার সাহস কেউ দেখায়নি। গ্রেট লিপের সময়ে আনেকেই দলীয় অনুগত্যে বাহিরে এসে কথা বলতে চায়নি। সেই সময়ে প্রচুর নিচু মানের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিলো । আগস্ট, ১৯৭৫ সালে বেঙ্কিউ ও সামান্তা বাঁধা ভয়াবহ ভাবে ভেঙ্গে যায়। কত জন সেই সময়ে প্রান হারান তা কেঊ জানতে পারেন নাই। সেই সঙ্খ্যাটা ছিলো ৮৬,০০০ হাজার থেকে ২৩০,০০০ এর মধ্যে । ১৯৬৬ সালের মধ্যে হেনান প্রদেশে ১১০ টি বাঁধ নির্মান করা হয়েছিলো তাদের প্রায় অর্ধেকই ভেঙ্গে যায়। ১৯৭৩ সালে ৫৫৪ বাঁধ ভেঙ্গে যায়। ১৯৮০ সালের মধ্যে চীনে প্রায় ২,৯৭৬ টি বাঁধ ভেঙ্গে গেছে । সেই বিশাল ক্ষাতি কেবল মানুষের জীবনের উপর দিয়েই যায়নি বরং পরিবেশকে ও মারাত্মক ভাবে নস্ট করে দিয়ে গেছে । মাটির ক্ষয়, মরুময়তা, বৃক্ষ নিধন সহ বিশাল ক্ষতি হয়েছে । (৬৩-৬৪)

স্পেরো তাঁর বইতে রাজনৈতিক মতপার্থ্যকে কথা বলেন বার বার । কিন্তু হিয়াং ওয়ানলী অনেক সাবলীন ভাষায় বিষয় টি পরিস্কার করে দেখিয়েছেন। তিনি বিরোধী ও মাওবাদিদের মধ্যে অনেক ইতিবাচক বতর্কের কথা বলেছেন। সানমেঞ্চিয়া বাধটি কেবল মাওবাদের সময় নির্মান হয়নি তা সংশোধন বাদের কালে কাজ হয়েছে। এমন ২০১০ সালে ও মাওবাদি এবং এর বিরুধীরা বাঁধ নির্মান প্রকল্পের প্রচুর সমালোচনা করে তাঁর পুনঃ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে হিউয়ান ওয়ানলী অনেক মন্তব্যই করেছেন যা মাওসেতুং এবং সমাজতন্ত্রের বিপক্ষে গেছে । অধিকন্ত বিশাল সোভিয়েতের ভূমিকা, বিপ্লবের সূচনা লগ্ন বিষয় গুলো অনেক ক্ষেত্রেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ১৯৬০ সাল থেকে বিপ্লবের কাজ এগিয়ে যেতে শুরু করলে ও রাষ্ট্রে মাওবাদ প্রভাব হারাতে থাকে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ও তাদের পক্ষে এরীয়ে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব ছিলো না ।


মাওবাদিগন বিকেন্দ্রীকরন, জনতাকে ব্যাপক প্রশিক্ষন প্রদান, জনগণের সাথে নানা বিষয়ে মতামত বিনিময় করা, পুঁজিবাদের উপর মানুষকে সমান দেয়া এবং বস্তুগত বিষয়ের প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করা । মাও আমলের মডেল হিসাবে চালু বড় বড় প্রভাব বলয় থেকে বেড়িয়ে আসার উদ্যোগ গ্রহন করা, বড় বড় শিল্প কারখানার পরিবর্তে ছোট ও মাঝারি ধরনের কারখানা স্থাপনে প্রয়াস গ্রহন । এই সকল পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল মূলত উৎপাদন শক্তির উপাদান সমূহের অপসারণ। কিন্তু এই কাজ করতে গিয়ে সোভিয়েত শক্তি ব্যার্থ হয়েছে। সম্ভবত মাওবাদিরা পানি ব্যবস্থাপনার নীতিতে তেমন কোন পরিবর্তন আনতে পারে নাই । মাওবাদিরা নিজেদের কাজে কর্মে স্বাধীন হবার চেষ্টা করেছে এবং সৃজনশীল কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করতে চেষ্টা করেছে । মাওবাদিরা সৌভিয়েত ইউনিয়নের তৈরী উন্নয়ন মডেলের পরিবর্তে নিজস্ব ধারা সৃষ্টি করেছে। এরা ক্রুসচেভ ও ব্রেজনেভের কর্ম ধারা পরিত্যাগ করে এক ভিন্ন প্রকৃতির সামাজিক সম্পর্ক বিনির্মানের চেষ্টা করেছে। ধারনা করা হয়ে থাকে যে মাওবাদিরা ১৯৬০ সালের দিকে সৌভিয়েতকে সঠিক মনে করত কিন্তু তারা ভেতরে ভেতরে সৌভিয়েত ধারার বিপরীতে – ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের’ ও বৃহত্তর শত্রু সাম্রাজ্যবাদী চক্র মার্কিনীদের বিরুদ্বে সম পর্যায়ের পদক্ষেপ নিতে প্রায়স চালায়। স্পেরো সেই বিষয়ে খুবই কম কথা বলেছেন। তিনি চীণের সকল কিছুর জন্য মাওসেতুং কে দায়ী করেছেন। অধিকন্তু, হিউইয়াং ওয়ানলী স্বীকার করেছেন যে মানুষ আত্মকেন্দ্রিক তা তিনি নিন্দা ও করেছেন। তিনি উন্নত সমাজের জন্য উন্নত মাওবাদিদের খোজ করেছেন। তিনি শ্রমিক শ্রেনী ও কৃষকদের জন্য বিপ্লবের অপরিহার্যতার কথা ও বলেছেন। কৃষক শ্রমিকের ভাগ্য নিয়ে খেলা করে । তাদের উৎপাদিত পন্য একটি সুবিধা ভোগী শ্রেনী কেড়ে নিয়ে নিজেদেরকে ভাগ্যবান মনে করে। তারা ভাবে “ আমরা কাজের জন্য বেশী উপযোগী মানুষ, আর ওদের তেমন যোগ্যতা নেই বলেই নোংরা অবস্থায় আছে”। হিউয়াং ওয়ানলীর এই বক্তব্যের সাথে কমিউনস্ট পার্টি ও একমত পোষণ করে থাকে । সত্যিকার ভাবে হিউয়াং ওয়ানলী কেবল পানি ব্যবস্থাপনা বিষয় ছাড়া আর সকল বিষয় ই কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সহমত পোষণ করেছেন। তিনি এক ভাষ্যে বলেছেনঃ “ দুনিয়া সুর্যের চার পার্শে ঘুরে আমি আপনি যাই বলি না কেন সে অন্য কোন দিকে যাবে না”। যদি চীনের বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন যে সানমিঞ্চিয়া বাঁধ টি উপযোগী নয় বা নিরাপদ নয় । কিন্তু চীনের রাজনীতিবিদ্গন তাদের নেতাকে কোন ভাবেই বিভ্রত করতে চাইবে না । স্পেরোর মতে, “ মতান্দ্বতা ও গোঁড়ামি মাওয়ের চিন্তা ধারাকে ব্যাপক ভাবে আচ্ছন্ন করে দিয়েছে। ফলে মানুষের অমিত শক্তিকে প্রকৃতির বিরুদ্বে কাজ লাগাচ্ছে চীন”।(৫৮-৬০)

ব্যাক্তিগত ব্যাপার


একজন বুদ্বিজীবীর ও একজন ব্যাক্তি হিসাবেই সকল দায় দায়িত্ব নিতে হয় । সেটা হোক পুরোপুরি বা সেটা হোক আংশিক, এটা যৌক্তিক হোক বা অযৌক্তিক হোক, এটা এরাবার কোন পথ নেই । একজন ব্যাক্তি মানুষের কর্মের মূল্যায়ন এত সহজ নয়, স্পেরো বলেন, রাজৈতিক হোক বা ক্ষমতা কাঠামোগত হোক, সকল ক্ষেত্রেই তা তদন্ত করে চুড়ান্ত সিদ্বান্তে যাওয়া দূরহ ব্যাপার। চীনের সমাজ ও এর ব্যাতিক্রম নয় । এখানে ও প্রতিবেদন দেখে মানুষের মূল্যায়ন করা জটিল বিষয়। উদাহরন হিসাবে মা ইনচুর কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি মতান্দ্বতা ও ধর্মান্দ্বতার সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন। তাকে কেউ বলতেন ম্যালতুসিয়ান আবার কেউ বলতেন বিপরীত কথা । তাকে কি কেবল ম্যালতুসিয়ান হিসাবে বিবেচনা করে অপদস্ত করা হয়েছে ? হয়তবা না বা হ্যা। একটি বিশেষ দিক হলো, মা ইনচু কি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ছিলেন ? তিনি বেইজিং বিশ্ব বিদ্যালয়ের একজন প্রধান হিসাবে একটি সম্মানিত স্থানে অধিস্টিত ছিলেন। ইহার কারনেই তিনি রাজনৈতিক ভাবে সম্পকীত ছিলেন। তিনি গতানুগতিক পন্থার অর্থনৈতিক অবস্থান থেকে আসলে ও তিনি প্রাশাসনিক রক্ষনশীলতার সাথে জড়িয়ে ছিলেন। স্পেরো বলেন, মা ইঞ্চু প্রধানত চৌ এন লাই এর সাথে ঘনিস্ট ছিলেন, তিনি মাওসেতুং এর নাম উল্লেখ করে ১৯৫৮ সালে নানিং সম্মেলনে সমালোচনা করেন। ১৯৫৬ সালে মাও বলেছিলেন, ওরা সকল বিষয়েই “অতি তাড়াতাড়ি করে”। তাদের বুঝে শুনে এগোনো দরকার। তারা এখন “ ডান পন্থীদের চেয়ে মাত্র ৫০ মিটার দূরত্বে অবস্থান করছে”। *** অন্য দিকে মা ইনচুকে তাঁর পদ থেকে অপসারণ করা হয় কেননা তাঁর জনসংখ্যা তত্ত্ব ইতিমধ্যেই বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তাকে তাঁর পদ থেকে অপসারনের পিছনে অন্যদেরকে সতর্ক করা ও উদ্দেশ্য ছিলো। একজন ব্যাক্তির পতন কেবল একটি কারনে নাও হতে পারে এর পিছনে অনেক কারন থাকে। স্পেরোর অনেক কথাই একপেশে ধরনের । তিনি তাঁর বইয়ে নানা ভাবে সমাজতন্ত্র ও মাওকে দোষারোপ করেছেন। যা আদতে সঠিক ছিলো না । সেই ভাবে মা ইনচু ও হিউয়াং ওয়ানলীর বিষয়ে ও নানা অলিক গল্প উপন্যাসের আশ্রয় তিনি নিয়েছেন। আমাদের গবেষণা ও বুঝা পড়ার মধ্যে এবং স্পেরোর দেখার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়ে গেছে ।

বুদ্বিজীবী ও নেতৃত্ব

স্পেরোর মতে, চীন বিপ্লবের নানা স্তরে বুদ্বিজীবীদের প্রতি নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির উঠা নামা হয়েছে। বিপ্লবের প্রথমিক স্তরে বা জনগনতান্ত্রিক সময় কালে বুদ্বিজীবীদেরকে ঐক্যফোরামের অংশ ভাবা হত এবং তাদেরকে কৃষক, শ্রমিক ও পাতিবুর্জয়া বা পুজিপতিদের শ্রেনী ভূক্ত লোক হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। শ্রেনী সংগ্রামকে জোরদার করার ক্ষেত্রে, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের গতিকে আরো বাড়ানোর কাজে এই শ্রেনীর লোকেরা কিছু ভূমিকা রেখেছেন। ফল কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরে ও সমাজের মধ্যে এদের সম্পর্কে নানা সময়ে নানা মতামত ও গড়ে উঠেছে। চীন বিপ্লব তাঁর যাত্রা পথে নানা স্তর অতিক্রমন করেছে। ১৯৫৩ সালে চীনের বিপ্লের পথে জনগনতান্ত্রিক অবস্থার পরিবর্তে সমাজতন্ত্রের পথ ধরা হয়।(২৫-২৬) তাই স্পেরোর মতে সেই সময়ে বুদ্বিজীবীদের সমাজে দাম কমেআয় যায়। স্পের দাবী করেন মাও লুই সুখীকে নিয়ে বুদ্বিজীবীদের সাথে কিভাব আচরন করা হবে তা ঠিক করে দেন। মুলত স্পেরো “ মহান ব্যাক্তি তত্ত্বে”র ধারা প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন। এবং সকল কিছুর জন্যই তিনি মাওকে জড়ানোর চেস্টায় ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রেই মাও নিজেকে দূরে রেখে পরিস্থিতির পর্যবেক্ষন করেছেন। যদি ও বিপ্লবকে এগিয়ে নেবার জন্য নেতার কোন বিকল্প নেই । ইহা কখনই নিজে নিজে এগিয়ে চূবেড়ান্ত লক্ষ্যে পৌছাতে পারেনা । সামাজিক প্রক্রিয়াই কেবল একটি সমাজের বিনির্মান করে দিতে পারে না । এখানে রোমান্টিকতা কোন স্থান নেই । অথচ স্পেরো এর ধারাই আক্রান্ত হয়ে নানা ভাবে মাও কে দুষী সাব্যস্থ করে গেছেন। চীনের বিপ্লবের পর তা প্রকৃতির জন্য একটি পর্যবেক্ষক ও পরামর্শকের ভূমিকা পালন করেছেঃ
“ নতুন সমাজে বুদ্বিজীবীগন স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে এক ধরনের ধোঁয়াশা মতামত দিয়েছে্ন। কনফুসিনের সময় থেকেই বুদ্বিজীবী মহল তাদের দায়িত্ব কর্তব্য বিষয়ে সচেতন ছিলেন। তারা চাইতেন মানুষ বন্দ্বুসুলভ মনোভাব নিয়ে সমালোচনা করুক। কিন্তু তারা দেখেছেন তৃন মূলের মানুষ কেমন করে নিপিড়নের শিকার হয়েছেন। লিখক, শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্বিজীবীগন নানা ভাবে নিপিড়িত হয়ে ও সামাজিক পরিবর্তনে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন”। (২৫)

এটা সত্য যে, চীনের বুদ্বিজীবীগন জনগনের অধিকার আদায়ের নানা লড়াই সংগ্রামে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে অধুনিক সময়ের প্রতিটি সংগ্রামে তাদের ভূমিকা ও উজ্জ্বল। ১৯১৯ সালে ৪ঠা মের আন্দোলনে তাদের ভূমিকা ছিলো অতি উজ্জল। যা মাওকে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনে সাহায্য করেছে। কিন্তু সকল বুদ্বজীবীর ভূমিকা প্রগতিশীল ছিলো না । অনেকেই ছিলেন গতানুগতিক ধারার, প্রতিক্রিয়াশীল, সামন্তবাদি ভাব ধারার । সামগ্রীক ভাবে এদের অনেকেই প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল থেকে নিপিড়কের প্রতি অনুগত্য প্রকাশ করে ক্ষমা চাওয়ার তদবিরে থাকতেন। কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়েছিলো কেবল মাত্র সেই সকল লোকদেরকে নিয়ে যারা প্রচলিত নিপিড়িত ব্যবস্থা ভাঙ্গার স্বপ্ন দেখতেন। তবে কমিউনিস্ট পার্টি সেই সকল সামন্ত প্রভূ, কনফুসিয়ান ও চীনের প্রচলিত সাংস্কৃতির বিষয়ে সচেতন ছিল। অনেকে প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্বে যাবার পক্ষে ছিলেন না তারা পুরাতন ব্যবস্থায় থেকেই সকল কিছুর সমাধান চাইতেন। কনফুসিয়বাদ সেই সময়ে চীনের শিক্ষাব্যবস্থায় জড়িত ছিলো। তাতে অনেক নায়কের সৃজন করা হয় । যা মাও নিজে এবং স্পেরো ও সমালোচনা করেছেন। অনেক প্রচার চালাতে হয়েছে প্রচলিত অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্বে, সামন্তবাদের বিরুদ্বে এবং পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্বে । মাওবাদিরা আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে সাধারন মানুষের মন থেকে পুরাতন ভাবনা দুরী করনের প্রায়স চালিয়েছেন। কতিপয় বুদ্বিজীবী ছিলেন যারা বিদেশীদের প্রতি ছিলেন অনুগত। তবে জনগণ ঠিকই বুঝতে পারেন যে কারা সত্যিকার ভাবে তাদের কথা ভাবে । ফলে মানুষ বিপ্লবী কর্মে ধারুন ভাবে অংশ নিয়ে বিপ্লবের পথকে প্রসস্ত করে দেন। কিন্তু স্পেরো সেই বিপ্লবী ধারাকে অত্যন্ত নগন্য ভাবে উপস্থাপনের প্রায়স পেছেন। এতে তাঁর অজ্ঞতাই ধারা পড়েছে।

বন হলো গাছের জন্য, মুল বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে

মাওবাদের সমাজ ব্যবস্থায় স্পেরো যে সকল বিষয়ের সমালোচনা করেছেন তা অনেক বুদ্বিজীবীরা ও করে গেছেন। তিনি পরিবেশ বিজ্ঞান ও চীনের গৃহিত নানা নীতির বিষয়ে কথা বলেছেন। তাঁর কথায় চীনের সমাজ অগণতান্ত্রিক নয় । তবে ইহার পরিবেশ বিজ্ঞানে কোন গতিশীলতা নেই । বরং চীনের সমাজে ব্যাপক স্বাধীনতা ও উদারতা বিদ্যমান। অধিকন্ত, মাওবাদিওদের আমলে সোভিয়েত সমাজের মতই একটি বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলগত পরিস্থিতি চীনের সমাজে ও বিরাজমান ছিলো। মাওবাদি তাদের কার্যক্রমে সর্বদাই মানুষের ক্ষমতাকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছে। কিন্তু স্পেরো সেই দিক গুলোকে পরিবেশের প্রতি বৈরী নীতি বলে প্রকাশের চেষ্টা করেছেন। তিনি মাওবাদের সময়ে চীনের সামগ্রীক উন্নয়নের বিষয় টি এড়িয়ে গেছেন। মাওবাদিগন সমালোচনা করতে গিয়ে “ সকলের বিরুদ্বে একটি অংগুলের উত্তোলন” বলে অভিহিত করেছেন। আসল কথা হলো সমাজের সামগ্রীক উন্নয়ন করতে গিয়ে কিছু কিছু মন্দনীতির অনুসরন হয়ে গেছে কিন্তু তা সামাজিক ও বিজ্ঞানের সামগ্রীক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে গেছে। বিপ্লবের আগে চীন ছিলো একটি রুগ্ন দেশ। সেখানে সামন্তবাদ, সেমি সামন্তবাদ, কমিশন ভোগী, আমলা পুজিপতিদের লিলা ভূমি ছিলো। উৎপাদন ব্যবস্থা তারাই নিয়ন্ত্রন করতেন। সর্বত্র ছিলো দারিদ্রতা । চীনের বেশীর ভাগ মানুষ চরম দরিদ্র ও গরীব কৃষক ছিলো। দাসত্ব ছিলো সমাজের অংশ। অনেক চাইনিচ মানুষই ইউরূপে গোলাম হিসাবে বসবাস করত। দূর্ভোগ ছিলো একটি সাধারন ঘটনা । সারা দেশে মহামারী লেগে থাকত। চীনের নাগরীকদের জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থার তেমন কোন সুযোগই ছিলো না । নারীদেরকে পন্য হিসাবে বিবেচনা করা হত। নারীদের পা ছোট করে রাখা হত যেন এরা সহজেই নিয়ন্ত্রিত থাকতে পারে। এরা পুরুষদের দাসী ছাড়া আর কিছুই ছিলো না । বিজ্ঞানের কোন প্রকার উন্নতি হয় নাই। সাম্রাজ্যবাদ চীনের উপর অন্দ্বকারের এক চাঁদর টেনে দিয়েছিলো। সরকার ছিলো খুবই দুর্বল। প্রায়স উপদলীয় কোন্দল লেগেই থাকত। ১৯৩৭ সালে সাম্রাজ্যবাদী জাপান চীন আক্রমণ করে বসে। সেই সময়ে চীনের কমিউনস্টগন নানা দিক থেকে আক্রন্ত হয়ে পড়েন। এরা চীনের জনগনের উপর নানা ভাবে নিপিড়ন চালাতে থাকে । তখন মাওবাদিরা “দুই পাহাড়ের” বিরুদ্বে লড়াইয়ে লিপ্ত হয় তাদেরকে চীন থেকে অপসারণ করতে । সেই দুই পাহাড় হলো সাম্রাজ্যবাদ আর সামন্তবাদ। সেই পরিস্থিতিতে চীনের মানুষ মাওবাদিদের নেতৃত্বে একতাবদ্ব হয়ে সামাজিক বিপ্লবের পথে এগিয়ে আসেন। এরা সকলে মিলে সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকে দুষ্ট চক্র কে উচ্ছেদ করে সাম্যবাদের পথে এগিয়ে যায়।


নয়া চীনের উত্তান


১৯৪৯ সালের ১লা অক্টোবর তিয়েনয়ানমান স্কয়ারে মহান নেতা মাওসেতুং ঘোষণা করলেন “চীন উঠে দাঁড়াবে” । তিনি চীনের নব জন্মের ঘোষণা দিলেন। দুনিয়ার চার ভাগের এক ভাগ মানুষ নয়া দুনিয়া গড়ে তুলার জন্য এগিয়ে এলো। মাওবাদীদের সেই বিপ্লব ছিলো অত্যন্ত ব্যাপক ও সর্বপ্লাবী। সেই বিপ্লবের পরিকল্পনায় ছিলো সমাজ ব্যবস্থাকে পুনঃ গঠন করে সকল প্রকার নিপিড়ন নির্যাতনের অবসান করে সত্যিকার সাম্যবাদে উপনিত হবার। সেটা ছিলো সর্বকালের সেরা নারী বাদি আন্দোলন। দুনিয়ার চার ভাগের এক ভাগ নারী উঠে দাঁড়িয়ে উচু কন্ঠে বলে দিলো “এখন থেকে আমরা আর কারো সম্পত্তি নই”! সেই বিশাল এলাকা থেকে কিছু নির্মম রীতি নিতি তাৎক্ষণিক ভাবে অপসারণ করা হলো। গ্রেট লিপের সময় চীনের খাদ্য সমস্যার ও সমাধান করে দেয়া হলো। যে দেশ ছিলো অভাবের সেই দেশ হলো খাদ্য ভান্ডার । চিনের জনগণের আয়ুষ্কাল দ্বিগুন হয়ে দাঁড়ালো। শিশু মৃত্যুর হার ব্যাপক ভাবে কমে গেল । চীন শক্তি শালী হয়ে উঠলো। চীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মতই আগের তুলনায় অনেক ক্ষমতা অর্জন করতে লাগলো। এরা দুনিয়ার মানচিত্রে পারমানবিক শক্তির অধিকারী হয়ে গেল। সেখানে নয়া সংস্কৃতির বিকাশ হতে শুরু করল। সাম্য সমতার বিস্তার হতে থাকলো। “মানুষ মানুষের জন্য কাজ করতে প্রতিজ্ঞা করতে লাগলেন”। পুরাতন প্রতিক্রিয়াশীল শিল্প সাহিত্যের জায়গায় নতুন সাহিত্য ও শিল্প বিকশিত হতে দেখা গেল। বিশ্বের চার ভাগের এক মানুষের জন্য শিক্ষার দোয়ার খোলে গেল । অবারিত হলো শিক্ষা গ্রহনের সুযোগ সাধারন মানুষের জন্য । সকল জায়গায় নতুন নতুন বিদ্যালয় স্থাপিত হতে লাগলো। বেশীর ভাগ শ্রমিক, কৃষক, মজুর নয়া ব্যবস্থায় সুযোগ পেয়েছেন। শিক্ষা দিক্ষার সুযোগ অবারিত হয়ায় অধিক সংখ্যক মানুষ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, শিল্পী ও লিখক হতে পেরেছেন। আগের ব্যবস্থায় যা কোন দিন ই সম্ভব ছিলো না । শ্রমিক কৃষকদের মধ্য থেকে বুদ্বিজীবীদের বিকাশ হয়েছে। এসবের সকল কিছুই ছিলো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ফলাফল।

দ্বিমত পোষন ও তার সীমারেখা


স্পেরোর বয়ান অনুসারে, মাওসেতুং প্রকৃতির বিরুদ্বে যুদ্ব ঘোষণা করেছেন। নিরবে দ্বিমত পোষণ করা ও সেই যুদ্বের ই অংশ। স্পেরো বিকল্প হিসাবে পশ্চিমা গণতন্ত্রের কথা বলতে চেয়েছেন, রাজনৈতিক বহুত্ববাদের কথা উল্লেখ করেছেন, মানুষের বাক ও অনুসন্দ্বানের স্বাধিনতার প্রস্তাব করেছেন। তিনি অবাধ তথ্য প্রবাহের কথা বলেছেন। এই সকল বিষয় স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের আচরন কে হাল নাগাদ করতে সহায়তা করে। তাঁর সাথে ভিন্নমত ও মহান বিজ্ঞানের একটা যৌগ সাজস রয়েছে। ইহা প্রকৃতিকে সুরক্ষা দেয়। (৬৫) মানি আর না মানি আমাদেরকে শেষ পর্যন্ত এই পথে আসতেই হয়। আসল কথা হলো, ভিন্নমতের সুরক্ষা, অনুসন্দ্বানের স্বাধীনতা, এবং প্রশ্ন করার অধিকার ইত্যাদি বিষয় নিবিড় ভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বিরাজ মান আছে। পুঁজিবাদে আর যাই হোক রাজনৈতিক কার্যক্রমে একত্ববাদ কায়েম করেনি। ঐতিহাসিক ভাবে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নানা দিক থেকে দরিদ্র মানুষ, কর্মজীবী শ্রেনী এবং কৃষকের জন্য বহু রকমের সুবিধা প্রদান করেছে। কিন্তু সমালোচনাকে ইতিবাচক ভাবে গ্রহন না করায় ফলাফল ভালো হয়নি। বিপ্লবী কাজের লক্ষ্যই ছিলো সমালোচনা বা আত্মসমালোচনার পরিবেশ তৈরী করা । লিন পিয়াং একজন খাটি মাওবাদি হিসাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কালে বলেছিলেন এটা হলো আমাদের সকলের জন্য “বড় বিতর্কের সময়” এবং “জন গনতন্ত্রের চর্চা”। একটি মুক্ত সমাজে মানুষের দ্বান্দ্বিকতা সহজেই প্রকাশিত হয়। তবে বিপ্লবের কালে গতানুগতিক চিন্তার বুদ্বিজীবীরা কিছু সংকুচিত হয়ে পড়েন। এটা বাস্তবতা হলে ও আমরা বিপ্লবের ফলে সৌভিয়েত ও চীনে বিজ্ঞান এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখ করার মত অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। উভয় দেশ সামন্তবাদি পশ্চাৎ পদতায় আক্রান্ত ছিলো বিপ্লব তাদের চেহেরা পাল্টে দিয়েছে। সৌভিয়েত বিপ্লবের পর মাত্র এক দশকে দ্বিতীয় বিশ্ব মহারণের কালে ইহা একটি আধুনিক মহা শক্তি হিসাবে দুনিয়ার মানচিত্রে জায়গা করে নেয়। একেই ভাবে চীন সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে আধুনিক বিশ্বের একটি ক্ষমতাধর রাষ্ট্র হিসাবে দেখা দিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পথ ধরে মাত্র কয়েক দশকেই তারা পারমানবিক শক্তির অধিকারী হয়ে উঠে ।

সত্যিকার বিপ্লব তো আসলে জনগনের জন্যই; ইহা সামাজিক অগ্রগতি না এনে পারে না । সেই ক্ষেত্রে উন্নয়ন ধারায় কেবল নেতা নয় সাধারন মানুষ ও সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালিন করে থাকে। নেতার তখন কেবল কাজ থাকে মানুষকে সহায়তা করা । জনগণ কি কি করবেন আর কি কি করা থেকে বিরত থাকবে তা নির্দেশনা দেয়া । কোনটি ভুল আর কোন টি সঠিক তা নির্নয় করে দেয়া । আলোকিত সাম্যবাদ বলে জনগণকে সাথে নিয়ে সকল কর্ম সাম্পাদন করতে হবে। কাজ করতে করতে শিখতে হবে, উন্নয়ন ঘটাতে হবে, সমালোচনা চলবে, আত্মসমালোচনা করার পরিবেশ রাখতে হবে। ইহা ই সত্যিকার বিজ্ঞান। আলোকিত সাম্যবাদ সেই বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে চায়। এমন কি বিগত দিনে ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে কি কি বিষয়ে ভিন্নমত ছিলো, বিজ্ঞান বিকাশে কি কি বাঁধা ছিলো তাঁর ব্যাখ্যা ও আলোকিত সাম্যবাদিগন সকলের সামনে তুলে ধরতে চায়।

১. একটি বিষয় সকলের নিকট পরিস্কার হওয়া দরকার – আলোকিত সাম্যবাদিগন দুনিয়ার সকল মানুষ ও পরিবেশকে সকল প্রকার নিপিড়ন ও শোষণ থেকে মুক্ত করতে চায়। প্রলেতারিয়েত রাজনীতির মূলমন্ত্র হলো বিশ্ব স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। পরিবেশ বা প্রতিবেশকে বিনাশ করে প্রলেতারিয়েত শ্রেনীর মুক্তি আসবে না। ধরিত্রীর মুক্তি প্রলেতারিয়েত বিপ্লবের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য ।


২. আমরা এমন একটি সমাজ বিনির্মান করতে চাই যে সমাজে মানুষের সামগ্রীক মুক্তি ও পরিবেশের সুরক্ষার জন্য প্রাগ্রসর বিজ্ঞানের প্রয়োগ করা হবে । এই সকল বিষয় ভালোভাবে বাস্তবায়নের জন্য উন্নত সংস্কৃতি ও আধুনিক বিজ্ঞানে বিকাশ ঘটাতে চাই। আমরা সমাজে দ্বিমত ও বিতর্কের পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সৃজনশীল ও উন্নত সাংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ বহাল রাখতে চাই।


৩. আমরা বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রতিস্টান এবং বুদ্বি বৃত্তিক চর্চার জন্য মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে বদ্বপরিকর। যে সমাজে নানা বিষয় নিয়ে মানুষ পরিক্ষা নিরিক্ষা করতে পারবেন। সমাজের সকল দিক থেকে প্রচেস্টা চালানো হবে যেন সমাজে কোন প্রকার নিপিড়ন নির্যাতন বা পরিবেশ বিনাশী কর্ম সংগঠিত না হতে পারে। সমাজের অধিক সংখ্যক মানুষ দিনে দিনে বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক হাতিয়ার ব্যবহার করতে শিখবে। আমরা উন্নত প্রযুক্তিগত বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দিব। ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষ পরস্পরের সাথে নানা বিষয় নিয়ে মত বিনিমিয়ের সুবিধা পাবে। আমরা আইন প্রনয়নের মাধ্যমে মানুষের বাক স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করব, বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে মুক্ত বুদ্বির চর্চা অবারিত থাকবে। চিন্তকদের মধ্যে যারা সুপ্রমানিত ভাবে সমাজ বিনাশী কাজে লিপ্ত না হবে বা প্রতিবিপ্লবী হিসাবে ভূমিকা না রাখবে তাদের জন্য অবশ্যই সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। তবে যারা অন্যদেরকে নিপিড়ন করবে, বিপ্লব ধ্বংস করতে চাইবে, “পুজিবাদিদেরকে ক্ষমতায় আরোহনে” সহায়তা করবে তাদেরকে নিয়ন্তান্ত্রিক পন্থায় প্রতিরোধের ব্যবস্থা ও থাকবে। আমরা ঐতিহ্য গত ভাবে মানুষের মাঝে সৃজন শীল বিতর্ককে উৎসাহিত করে জ্ঞান বিজ্ঞানে বিকাশকে নিশ্চিত করব। জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশ ছাড়া আলোকিত সাম্যবাদের স্তরে পৌছানো সম্ভব নয়। আমাদের সমাজে কোন মানুষ কথা বলতে ভয় পাবে না । আমাদের সমাজে সাহসের চর্চা হবে উন্নত চিন্তার বিকাশ ঘটবে।

৪. বিপ্লবী বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটানো খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি কাজ, সমাজে আলোচনার পরিবেশ ও বিতর্ককে জোড় করে বা মতান্দ্বতা দিয়ে রোধ করা উচিৎ নয়। কেবল ধমক দিয়ে জয়ী হওয়া ঠিক নয়। যারা কেবল মানুষের মুখ বন্দ্ব করে বিজয়ি হতে বা থাকতে চান তা কোন দিন ই শান্তি দায়ক বা স্থায়ী হয় না । সেই বিজয় খুবই ঠুনকো। তারা লড়াইয়ে বিজয়ী হলে ও সত্যিকার জয় তারা পায় না । স্পেরোর মতে, চীনের মাওবাদিদের শাসনামলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিতর্ক বন্দ্ব করে দেয়া হয়েছিলো। ফলে সংশোধন পন্থার লোকেরা তা থেকে ফায়দা নিয়েছে। বিপ্লবী প্রকল্পের সকল ব্যার্থতা বিপ্লবীদের উপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেদেরকে নিরাপদ রেখেছেন। সেই সকল বিষয় অবশ্যই আগামী দিনের বিপ্লবীদেরকে মনে রাখতে হবে । মানুষের চিন্তাধারার উপর খড়গ নামিয়ে সামগ্রীক বিপ্লবী কর্ম সম্পাদন করা সম্ভব নয়।


৫. আমরা বিপ্লবের মাধ্যমে যুগান্তকারী ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাব। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে আমরা কোন প্রকার কার্পণ্য করব না । আমরা বিপ্লবী বিজ্ঞানকে সামাজিক পরিবর্তনের জন্য একটি কম্যান্ড হিসাবে গ্রহন করতে ভিত নই। আলোকিত সাম্যবাদ নিজে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সকল প্রকার মতান্দ্বতাকে বিদূরিত করতে এবং বিজ্ঞান কে এগিয়ে নিতে অংগীকারাবদ্ব।

আলোকিত সাম্যবাদ বনাম উদারতাবাদ


স্পেরো যা যে ভাবে দেখতে চেয়েছেন তিনি তা সেই ভাবেই দেখেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে তিনি যে সমালোচনা করেছেন তাও সঠিক। তিনি সেই সময়কার উচু স্তরের কতিপয় নেতা কার্যক্রম বিস্লেশন করে দেখিয়েছেন তা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ছিলো। কিন্তু আসল জিনিসই দেখেন নাই। চীনের সমাজের আমূল পরিবর্তন ও বিশাল সাফল্য । বিশ্বের চার ভাগের এক ভাগ মানুষের জীবনে কি পরিবর্তন এনে দিয়েছিলো সেই মহান বিপ্লব। কিভাবে সাধারন মানুষের সামনে খোলে গিয়েছিলো উন্নয়নের দোয়ার। উচু স্তরের ব্যাক্তিদের জন্য কিছু সমস্য হয়েছে, তাদের মাঝে মতামত নিয়ে কিছু নেতিবাচক ঘটনা ও ঘটেছে। তবে বহু সাধারন মানুষ তথা শ্রমিক, কৃষক তাদের মতামত প্রকাশের, দ্বিমত জানাবার, কথা বলার সুবিধা অর্জন করেছিলো। তারা ও বুদ্বিজীবীদের কাতারে এসে কথা বলতে পেড়েছেন। স্পেরো বুঝতে পারেননি, “বিপ্লব কোন ডিনার পার্টি নয়”। ইহা একটি জটিল প্রক্রিয়ার নাম । তা নানা চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। মাওবাদি বিপ্লবের মধ্যে কোন ব্যার্থতা নেই , ব্যার্থতা আছে তাঁর দেখার মাঝে। তাঁর চিন্তা ও চেতনার মাঝে। স্পেরো মাওবাদি বিপ্লবকে পুঁজিবাদের বিকল্প হিসাবে বিবেচনা করেন নাই। পুঁজিবাদ দুনিয়ার পরিবেশের বারটা বাজিয়ে দিচ্ছে । তিনি পাশ্চাত্য ধারা সমাধানের কথা বলেছেন । অথচ পাশ্চাত্য দুনিয়া নিজেই পরিবেশ গত সমস্যা নিয়ে জটিলতায় ভোগছে। এখন সর্বত্রই এক টি ঐক্যমত গড়ে উঠছে যে, আধুনিক জীবন যাপনের ফলে পরিবেশের উপর এক ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে। এখন ভোগবাদ শক্তিশালী হচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এর প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবে । স্পেরো কেবল মাওবাদি রাজনীতির সমালোচনা করেছেন। মাওবাদিদের সদিচ্ছার কথা একবার ও বলেন নাই । অনেক সমস্যা থাকে যা সমাধানের জন্য সময় ও সক্ষমতার দরকার হয়। অনেক উদারতাবাদি সমাজ আছে যাদের এই ধরনের কাজ করারই সামর্থ নেই। তাঁর দৃষ্টি ভঙ্গী সর্ববৈ বুর্জোয়া । এটা তো সত্য কথা, পুঁজিবাদ সীমাহীন ভাবে ব্যবসার জন্য, মুনাফা অর্জনের জন্য, অবিরত ভোগের জন্য পরিবেশকে বিনাশ করেই চলেছে । স্পেরো সেই দিকে নজরই দিতে চাইছেন না । আমরা মনে করি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দৃঢ় অঙ্গীকার, ও সাহস থাকলে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারলে পরিবেশের মত একটি বিষয়ের সমাধান করা মোটেই কঠিন কিছু নয়। তাই, দরকার হলো বিপ্লবী বিজ্ঞানের ভিত্তিতে সমাজ বিনির্মান । অর্থাৎ প্রলেতারিতের নেতৃত্বে সমাজ পরিচালনার পরিবেশ প্রতিস্টা করা । টেকসই সমাজ সৃজন ও রক্ষার জন্য প্রলেতারিত শ্রেনীই সঠিক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। কেননা এরাই সমাজের মূল চালিকা শক্তি। এরাই সত্যিকার বিপ্লবী জনসমাজ। ওরাই সকল কিছু সৃজন করে । আলোকিত সাম্যবাদ প্রলেতারিয়তকে নিয়ে প্রগতি ও শান্তির সমাজ এবং পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে।


Sources:


Shapiro, Judith. Mao’s War Against Nature: Politics and the Environment in Revolutionary China (Cambridge University Press, USA:1991)
* http://en.wikipedia.org/wiki/One-child_policy
** http://en.wikipedia.org/wiki/Sanmenxia_Dam
*** http://jessecurtis.blogspot.com/…/great-leap-forward-famine…